জেনে নিন, ২৫ টি লাভজনক ম্যানুফ্যাকচারিং ব্যবসার আইডিয়া!

যেকোনও দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি উত্পাদন শিল্প। ভারী শিল্পের পাশাপাশি ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি উত্পাদন শিল্পের একটার বড় ধরণের ভূমিকা থাকে দেশের অর্থৈনৈতিক উন্নতিতে। আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশের ক্ষেত্রে এই ধরণের ছোট ম্যানুফ্যাকচারিং ব্যবসার গুরুত্ব অপরিসীম।

অল্প পুঁজিতে ও কম লোক বল নিয়ে শুরু করা যায় এরকমই ২৫টি উত্পাদনমুখী ব্যবসার সন্ধান আজ আমরা দেব। উত্পাদনমুখী ব্যবসায় জিনিসের গুণমানই ব্যবসায়িক সাফল্যের চাবিকাঠি।

আজ আমরা এমন কয়েকটি ব্যবসা আইডিয়া নিয়ে আলোচনা করব যা শুরু করতে খুব বেশি প্রাথমিক বিনিয়োগের প্রয়োজন নেই, প্রয়োজন নেই খুব বড় ধরণের কোনও পরিকাঠামো কিন্তু সঠিক পথে চলতে পারলে মুনাফা নিশ্চিত।

১. কাগজ তৈরির ব্যবসা

কাগজের চাহিদা সবসময়েই রয়েছে। আমাদের দেশে কাঁচামাল যোগাড় করাও সহজ। কাগজ তৈরির যন্ত্র ও কাঁচা মাল মিলিয়ে প্রাথমিক খরচ ২ লক্ষ টাকার মধ্যে। এ-টু, এ-থ্রি, এ-ফোর এই তিন মাপের কাগজের চাহিদা সব থেকে বেশি। এছাড়ও হাফ ডিমাই, ফুল ডিমাই ইত্যাদি নানা মাপের ছাপার কাগজেরও চাহিদা রয়েছে বাজারে। কাগজের পাশাপাশি খাতা বাঁধাইয়ের ব্যবস্থাও রাখা যেতে পারে।

২. কাগজের ব্যাগ ও হাল্কা পিচবোর্ডের বাক্স তৈরি

পরিবেশ সচেতনতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্লাস্টিকের ব্যবহার কমছে, বাড়ছে কাগজের ব্যাগের চাহিদা। বিভিন্ন মাপের কাগজের ব্যাগের প্রয়োজন হয় দোকানগুলিতে। অনেক দোকান আবার পুরনো খবর কাগজ দিয়ে তৈরি ব্যাগও ব্যবহার করছে জিনিস বিক্রির জন্য।

এছাড়াও তৈরি করতে পারেন হাল্কা পিচবোর্ডের বাক্স। মিষ্টির দোকান থেকে শাড়ির দোকান, এই ধরণের বাক্সের চাহিদা কিন্তু রয়েইছে।

৩. মোবাইল ফোন-এর আনুষাঙ্গিক তৈরি

স্মার্ট ফোন আজ প্রত্যেকের হাতে, এই স্মার্ট ফোন-এর বিভিন্ন আনুষাঙ্গিক জিনিস তৈরি করে ভাল রকম লাভ করার সুযোগ রয়েছে। স্মার্ট ফোন-এর ব্যাক কভার, স্ক্রিন গার্ড ইত্যাদি তৈরি করা যেতে পারে। এই উত্পাদনমুখী ব্যবসায় অল্প বিনিয়োগে বেশি লাভ সম্ভব।

৪. ঘরে বিস্কুট তৈরির ব্যবসা

বাজারে হরেক রকমের নামি দামী কোম্পানির বিস্কুট পাওয়া গেলেও ঘরে তৈরি তাজা বিস্কুটের চাহিদা আছে। বিস্কুটের স্বাদ ভাল হলে চায়ের দোকান বা পাড়ার মুদি দোকান থেকে সহজেই এই বিস্কুট বিক্রি করা সম্ভব। কাঁচামাল ও ওভেন মিলিয়ে বিনিয়োগ ৩০ হাজার টাকার কাছাকাছি।

৫.  জৈব সার তৈরির ব্যবসা

ভারত কৃষি প্রধান দেশে, ফলে এদেশে সারের বিপুল চাহিদা রয়েছে। নিজের এবং আসে পাশের বাড়ির বর্জ্য থেকেই জৈব সার তৈরি করা সম্ভব। স্থানীয় বাজারে সরাসরি চাষীদের বা বিভিন্ন নার্সারিকে এই সার বিক্রি করতে পারেন। এই ম্যানুফ্যাকচারিং ব্যবসাতেও লাভ ভালই।

৬. কাঠের হাতা-খুন্তি তৈরি

নন্-স্টিক পাত্রের ব্যবহারের ফলে প্রচুর চাহিদা তৈরি হয়েছে কাঠের তৈরি হাতা খুন্তির। প্রতি বাড়িতেই নিয়মিত এই হাতা খুন্তি কেনা হয়, এছাড়াও রয়েছে হোটেল রেস্তোঁরা। ভাল মানের কাঠের হাতা পেতে অনেক সময়েই সমস্যায় পড়ে ক্রেতা, তাই এই হাতা উত্পাদন করে ভাল ব্যবসা করতে পারবেন। নিজের দোকান খুলেও বিক্রি করতে পারেন অথবা অন্য দোকানেও সরবরাহ করতে পারেন।

৭. পনীর, মাখন ও ঘি তৈরি

বাড়িতে সহজেই পনীর, ঘি বা মাখন তৈরি করা সম্ভব, বিনিয়োগ নাম মাত্র, লাভ অনেক। বাড়িতে তৈরি এই সব দ্রব্যের মান অনেক সময়েই বাজারে পাওয়া যাওয়া বড় কোম্পানির পণ্যের থেকেও ভাল হয়, তাই ক্রেতা কেনেন খুশি মনে। ক্রেতার পছন্দ হলে বারবারই তারা ফিরে আসবেন আপনার পণ্য কিনতে।

৮. ড্রাই ও ফ্রোজেন ফ্রুট তৈরি

আমাদের দেশে শুকনো ও ফ্রোজেন ফলের বাজার তৈরি হলেও যোগান এখনও অনেকটাই কম। বিভিন্ন বেকারির আইটেম, স্মুদি ইত্যাদি তৈরিতে কাজে লাগে এই ফল। কম টাকায় এই ম্যানুফ্যাকচারিং ব্যবসা শুরু করে লাভের সুযোগ রয়েছে ভাল।

৯. রবারের কার্পেট, পাপোস ও টেবিল ক্লথ তৈরি

বাড়ি, হোটেল বা অফিস সর্বত্রই প্রয়োজন হয় রবারের তৈরি কার্পেট, পাপোস বা টেবিল ক্লথ। ব্যবহারের সুবিধার জন্য রবারের তৈরি এই পণ্যের চাহিদা অত্যন্ত বেশি। নানা ধরণের আকর্ষণীয় নকশার কার্পেট বা পাপোস তৈরি করতে পারলে বিক্রি আটকাবে না। প্রয়োজনীয় যন্ত্র, রাসায়নিক ও কাঁচামাল মিলিয়ে প্রাথমিক খরচ ২ লক্ষ টাকার কাছাকাছি।

১০. বিছানার চাদর ও বালিশের ঢাকনা তৈরি

বড় সড় কোম্পানির চাদর বা বালিশের ঢাকনা বাজারে পাওয়া গেলেও স্থানীয়ভাবে তৈরি চাদর বা বালিশের কভারের বিপুল চাহিদা রয়েছে আমাদের দেশে। এই উত্পাদনমুখী ব্যবসা শুরু করতে হলে খানিক বড় একটা জায়গা লাগবে, আর লাগবে তাঁত বা বৈদ্যুতিক বয়ন যন্ত্র।

১১. পাঁউরুটি তৈরি

বাঙালির খাদ্য তালিকায় পাকাপাকি জায়গা করে নিয়েছে পাঁউরুটি। পুষ্টিগুণ ও সহজলভ্যতার কারণে প্রায় প্রতিদিনে খাবার তালিকায় থাকে পাঁউরুটি। কম বিনিয়োগেই এই ব্যবসা শুরু করতে পারেন। লাইসেন্স পাওয়ার ঝক্কিও কম। স্বাস্থ্যকর ভাবে তৈরি করে ভাল প্যাকেজিং-এ বিক্রি করতে পারলে ভাল লাভ হবে এই ব্যবসায়।

১২. ন্যাপথলিন তৈরি

জামাকাপড়কে পোকা মাকড়ের হাত থেকে বাঁচাতে বা বাথরুম-পায়খানা থেকে পোকা তাড়াতে সর্বত্রই ব্যবহৃত হয় ন্যাপথলিন বল। ন্যাপথলিন ট্যবলেট তৈরির যন্ত্র দিয়ে এই বল তৈরি করে বাজারে বিক্রি করতে পারেন। খেয়াল রাখতে হবে যাতে ন্যাপথলিনের গুণমান ভাল হয়, গলে গিয়ে জামা কাপড় নষ্ট না করে।

১৩. চানাচুর নিমকি তৈরি

নিমকি, চানাচুর, ডালমুট ইত্যাদির ব্যাপক চাহিদা রয়েছে ভারতের বাজারে ফলে রয়েছে লাভের সুযোগও। খুব বেশি বিনিয়োগের প্রয়োজন নেই এই উত্পানমুখী ব্যবসায়। তবে প্রয়োজন যন্ত্র বসানোর জন্য কিছুটা জায়গার।

১৪. খেলনা তৈরি

বাচ্চাদের রকমারি খেলনা তৈরি করে অল্প পুঁজিতেই লাভজনক ব্যবসা শুরু করতে পারেন। সারা বছরই এই পণ্যের চাহিদা রয়েছে। আপনার কারখানায় খেলনা তৈরি করে তা সরবরাহ করতে পারেন সারা দেশে। প্লাস্টিকের খেলনা যেমন তৈরি করতে পারেন, তেমনই তৈরি করতে পারেন কাঠের খেলনাও।

১৫. হাতে বানানো সাবান তৈরি

প্রাকৃতিক উত্স থেকে তৈরি হাতে বানানো সাবানের চাহিদা তৈরি হয়েছে আমাদের দেশে। নানা গন্ধ ও উপকরণের এই সাবান বিক্রি করতে পারেন শহরের বিভিন্ন দোকানে। নতুন নতুন ধরণের সাবান তৈরি করতে পারলে ভাল দামও পাওয়া যাবে।

১৬. বাদাম তেল তৈরি

নারকেল, সর্ষে বা সূর্যমুখীর তেলের বাইরেও অন্যান্য নানা শস্য ও বাদামের তেলের চাহিদা বাড়ছে। রান্নার পাশাপাশি ত্বক ও চুলের জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে এই তেল। স্পা-গুলিতে এই সব প্রাকৃতিক স্বাস্থ্যকর তেলের প্রচুর চাহিদা। এছাড়া বাড়িতেও রূপচর্চার জন্য অনেকেই এই তেল কিনে থাকেন। এই উত্পাদনমুখী ব্যবসা শুরু করতে হলে প্রতিটি তেলের গুণাগুণ জেনে নিতে হবে, জানতে হবে কোন তেল কতদিন ভাল থাকে।

১৭. মধু তৈরি

মধু তৈরির জন্য প্রয়োজন মৌমাছি চাষ করা। উপযুক্ত পরিবেশ ও জায়গা থাকলে এই ব্যবসা শুরু করতে পারেন। প্রাথমিক খরচ হবে ২৫ থেকে ৫০ হাজার টাকার মধ্যে। মধুর চাহিদা সব জায়গাতেই রয়েছে, আর স্থানীয়ভাবে তৈরি এই মধুর মানও হয় ভাল।

১৮. জ্যাম ও জেলি তৈরি

ঘর থেকেই এই ব্যবসা শুরু করা সম্ভব। প্রাথমিক খরচ ২৫,০০০ টাকার মধ্যে। প্রয়োজন হবে ফল, সাইট্রিক অ্যাসিড, খাবারে দেওয়ার রং, খাবার সংরক্ষণকর ও বোতল।

১৯. বায়োপ্লাস্টিক প্যাকেজিং

এই প্যাকেজিং-এ বর্জ্য কম হওয়ায় ইদানিংকালে এই চাহিদা বাড়ছে। রেস্তোঁরার খাবার বা আলুর চিপস্-এর প্যাকেজিং বিভিন্ন জায়গাতেই ব্যবহার হচ্ছে এই প্যাকেজিং। হয় আপনি নিজের বায়ো প্লাস্টিক উপাদান তৈরি করতে পারেন অথবা বাজার থেকে কিনে প্রথাগত প্লাস্টিক মোল্ডিং প্রযুক্তির সাহায্যে বানাতে পারেন পাত্র।

২০. অ্যালুমিনিয়ামের দরজা ও জানলা তৈরি

ভারত পৃথিবীর পঞ্চম বৃহত্তম অ্যালুমিনিয়াম উত্পাদনকারী দেশ। এদেশের ইমারতি শিল্পে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয় এই হালকা অথচ পোক্ত ধাতু। অ্যালুমিনিয়ামের দরজা ও জানলা তৈরি একটি লাভজনক উত্পাদনমুখী ব্যবসা। কারখানার তৈরিতে প্রাথমিকভাবে বেশ খানিকটা খরচ হলেও লাভ আসবে অচিরেই।

২১. নারকেলের দুধের পাউডার তৈরি

নারকেলের দুধের চাহিদা রয়েছে দেশ জুড়ে, এমন কি বিদেশের বাজারেও এর চাহিদা রয়েছে যথেষ্ট। এই পাউডার বেশি দিন ধরে রেখে দেওয়া যায় ও প্যাকেজিংয়ের খরচও কম। বর্তমানে ছোট উত্পাদন ব্যবসায়ীদের মধ্যে এই ব্যবসার জনপ্রিয়তা বেড়েছে।

২২. আটা-ময়দা তৈরি

খুবই সাধারণ যন্ত্র দিয়ে কম খরচে এই ব্যবসা শুরু করা সম্ভব। চাহিদা তো রয়েছে সর্বত্রই। আদা, ময়দা, সুজি, কর্ণফ্লওয়র ইত্যাদি সবই তৈরি করতে পারেন আপনার কারখানায়। তবে বড় করে ব্যবসা শুরু করতে হলে খানিকটা পুঁজি লাগবে।

২৩. আদা ও রসুনের পেস্ট তৈরি

আজকের ব্যস্ততার যুগে আদা-রসুন বাড়িতে বাটার বদলে রেডিমেড কিনে ব্যবহার করতেই পছন্দ করেন বেশিরভাগ মানুষ। আর এই সম্ভবনাকে কাজে লাগিয়েই শুরু করতে পারেন আপনার ম্যানুফ্যাকচারিং ব্যবসা।

২৪. নুডলস্ তৈরি

দুধরণের যন্ত্রে সাহায্যে নুডলস্ তৈরি করা যায়: সেমি-অটোমেটিক বা সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয়। এবিষয়ে কোনও বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিয়ে প্রয়োজন মতো যন্ত্র কেনা জরুরি। এই উত্পাদন ব্যবসা শুরু করতে অন্ততঃ ৭০০ বর্গফুট জায়গা প্রয়োজন।

২৫. রবারের স্ট্যাম্প তৈরি

সব অফিসেই চাহিদা রয়েছে পলিমার রবার স্ট্যাম্প-এর। অত্যন্ত কম পুঁজি নিয়ে এই উত্পাদন ব্যবসা শুরু করা সম্ভব। সাধারণ রবার স্ট্যাম্প তৈরির পাশাপাশি তৈরি করতে পারেন প্রি-ইঙ্কড্ অর্থাত্ কালি দেওয়া স্ট্যাম্পও।

পরিকাঠামো ও কাঁচামালের প্রয়োজনীয়তার জন্য পরিষেবাভিত্তিক ব্যবসার থেকে উত্পাদনমুখী ব্যবসায় প্রাথমিক খরচ সব সময়েই খানিক বেশি। তবে এই ব্যবসার লাভের নিশ্চয়তাও অনেক বেশি। মানুষের প্রয়োজনীয় জিনিস তৈরি করে বাজারে পৌঁছে দিতে পারলে কখনই ক্রেতার অভাব হবে না। সঠিক পরিকল্পনা করে এগোন লাভ হবেই।

No comments: