ভাষানচর (vashanchar) সম্পর্কে এত কৌতূহল কেন?

vashanchar

ভাসানচর এলাকা নিয়ে আমাদের অনেকের ভেতরে প্রচুর কৌতুহল রয়েছে । আমরা জানি মায়ানমার থেকে আগত রোহিঙ্গা সম্প্রদায়দের বসবাসের জন্য বাংলাদেশ সরকার তাদের একটা জায়গা করে দিয়েছে । আর সেই আবাসস্থল অথবা জায়গাটি ভাসানচর নামে পরিচিত।  আজকে আমরা ভাষা খুঁটিনাটি সব কিছু জানবো। বলা যায়না এবারের বিসিএস পরীক্ষায় এখান থেকে প্রচুর প্রশ্ন আসতে পারে । বিসিএস পরীক্ষা বলাকথা ব্যাপারটা চার্ট এখানে বিষয় নয়। 

ভাসানচর এলাকাটি চর পিয়া নামেও পরিচিত যা বাংলাদেশের হাতিয়া উপজেলার একটি দ্বীপ। ২০১৯ সাল পর্যন্ত এই দ্বীপটি ঠেঙ্গারচর নামেও পরিচিত ছিল। এটি বঙ্গোপসাগরের সন্দ্বীপ থেকে প্রায় ৬ কিলোমিটার অথবা ৩.৭  মাইল এবং মূল ভূখন্ড থেকে ৩৭ মাইল দূরে অবস্থিত । 

এই দ্বীপটি ২০০৬ সালে হিমালয় পলি দ্বারা গঠিত হয়েছিল। ভাসানচর দ্বীপ টি প্রায় ৪০  বর্গকিলোমিটার প্রশস্ত।  মাইলের হিসাবে ১৫ বর্গমাইল এবং চার হাজার হেক্টর। বাংলাদেশ সরকার কক্সবাজারের মূল ভূখণ্ড শিবির থেকে 1 লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীদের কে স্থানান্তরের জন্য ১২০ টি সাইক্লোন শেল্টার সহ মোট ১৪০ টি ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা করেছে যা বর্তমানে বসবাসের উপযুক্ত হয়েছে। যদিও সরকার প্রথমদিকে ২০১৫ সালের জুন মাসে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের কে দ্বীপে পূনর্বাসনের পরামর্শ দিয়েছিল। আর সেটিকে জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা লজিস্টিক্যালি চ্যালেঞ্জিং হিসেবে চিহ্নিত করেছিল। কিন্তু বাংলাদেশ সরকার তাদের পুনর্বাসনের জন্য সব ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করার জন্য আদেশ দেয়।  কিন্তু এক্ষেত্রেও হিউম্যান রাইটস ওয়াচ একে একটি মানবাধিকার এবং মানবিক বিপর্যয় বলে অভিহিত করেছে। 

বাংলাদেশ সরকার ২০১৯ সালে আশ্রয়প্রাপ্ত গ্রহণের জন্য উদ্যোগ নেয় যেখানে এক লক্ষ শরণার্থীদেরকে বসবাসের উপযুক্ত জায়গা করে দেবে। তাদের জন্য এমন এক ধরনের বাড়ি নির্মাণের প্রস্তাবনা করা হয় যেটা সাগরের জোয়ারের পানিতেও ক্ষতিগ্রস্ত হবে না'।  আর এর জন্য এই ঘর গুলোকে মাটি থেকে চার ফুট উপরে নির্মাণ করা হয়েছে। ২০১৯ সালের পাবলিক ওয়ার্ক এর পরিমাণ ছিল ৩০৯.৫ মিলিয়ন টাকা সমপরিমাণ যা প্রাথমিক বরাদ্দের চেয়েও ৩৪ শতাংশ বেশি। এছাড়াও বসবাসের উপযুক্ত বাড়ি নির্মাণের পাশাপাশি আরো কিছু অতিরিক্ত পরিকল্পনা রয়েছে যেমন সেখানে গুচ্ছগ্রাম,  মসজিদ,  আশ্রয় কেন্দ্র,  হাসপাতাল,  পানির চ্যানেল অবকাঠামো,  রাস্তা,  চাষের জন্য অবকাঠামো এবং অন্যান্য প্রকল্পের অধীনে ভূমি উন্নয়ন কাজ।  ইতিমধ্যেই আমরা বিভিন্ন গণমাধ্যমের কল্যাণে দেখতে পেরেছি বাংলাদেশ নৌ বাহিনী দৃষ্টিনন্দন অনেক অবকাঠামো তৈরি করেছে। 

২০২০ সালের জানুয়ারিতে রোহিঙ্গা নেতাদের এবং মানবাধিকার গোষ্ঠীর বিরোধিতা সত্ত্বেও প্রকল্পটি এগিয়ে চলছিল।  আর সে সময় বাংলাদেশের শরণার্থী বিষয়ক মন্ত্রী বলেছিলেন দীপ্তি বসবাসের জন্য প্রস্তুত বা উপযুক্ত।  আর বর্তমানে আমরা গণমাধ্যমের কল্যাণে জানতে পেরেছি যে অনেকেই সেই দ্বীপে বসবাস করার জন্য স্থানান্তর হয়েছেন। যদিও প্রাথমিক পর্যায়ে অবকাঠামো নির্মাণ কালীন সময়ে সেখানে সাংবাদিক অথবা রোহিঙ্গা নেতাদের ভ্রমণের অনুমতি দেননি। 

২০২০ সালের ডিসেম্বর এবং ২০২১ সালের জানুয়ারির মধ্যে প্রথম দুইটি গ্রুপের প্রায় 4 হাজার রোহিঙ্গা শরণার্থীকে সেই দ্বীপে স্থানান্তর করা হয়েছে। এছাড়াও এ বছরের ২৯ শে জানুয়ারি আরো ১৭৭৮ জন রোহিঙ্গা শরণার্থী সেই দ্বীপে বসবাস করার জন্য যাত্রা করে। রোহিঙ্গা শরণার্থীদের কে স্থানান্তরের এই প্রক্রিয়াটা শেষ পর্যন্ত চলবে যতদিন পর্যন্ত না এক লক্ষ বা সকল রোহিঙ্গা  শরণার্থী স্থানান্তর হয়। এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ সরকার প্রায় 112 মিলিয়ন ডলার খরচ করেছে এর পেছনে । ২০২১ সালের ১৭ থেকে ২০ মার্চ ইউনাইটেড ন্যাশন ডেলিগেশন ভিজিট করে গিয়েছিল।  আরে সময় ১৩ হাজার রোহিঙ্গা এই দ্বীপে বসবাস করত।  UN Refugee Agency আসলে এই রিফুজি সংস্থাকে হেল্প করার জন্য এগিয়ে আসেনি।  রোহিঙ্গারা অর্থনীতিতে অবদান রাখতে পারে কিন্তু তার পরেও তাঁদেরকে এই দ্বীপে স্থানান্তরের ক্ষেত্রে সরকার পিছপা হবে না। 

মূলত এটা হচ্ছে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে একটি ক্ষণস্থায়ী সমাধান।  সরকারের উদ্দেশ্য হচ্ছে এই রোহিঙ্গা শরণার্থীদের কে তাদের দেশে ফিরিয়ে দেওয়া।  যতদিন পর্যন্ত এটা সম্ভব না হচ্ছে ততদিন পর্যন্ত তাদেরকে এখানেই রাখা হবে। এই দ্বীপে স্থানান্তরের বেলায় প্রথম গ্রুপের যারা ছিল তারা এক রকম জোরপূর্বক ভাবেই সেখানে স্থানান্তরিত হয়।  আরেকটা গ্রুপ রয়েছে যারা কক্সবাজারের জনবহুল পূর্ণ গুচ্ছগ্রামে থাকার চেয়ে দ্বীপে থাকাকেই নিরাপদ মনে করেন।  কারণ কক্সবাজারের ক্যাম্পে প্রতিনিয়ত মারামারি সহিংসতা লেগেই থাকে।  যার ফলে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে থাকার চেয়ে দ্বীপে বসবাস করায় নিরাপদ। 

বাংলাদেশ সরকার আশা করেছিল যে জাতিসংঘ এই ব্যাপারে উদ্যোগ গ্রহণ করবেন স্যার যেন রোহিঙ্গা শরণার্থীরা আন্তর্জাতিক সহায়তা পায়।  কিন্তু সে দিক থেকে বাংলাদেশ সরকারের সহযোগিতা এখনও পর্যন্ত পাইনি।  তবে সব ধরনের কূটনৈতিক তৎপরতা চলছে এই রোহিঙ্গা শরণার্থীদের কে তাদের দেশে ফেরত পাঠানোর ব্যাপারে যা আমরা বিভিন্ন গণমাধ্যমের মাধ্যমে জানতে পেরেছি। 

ভাসানচরে মানুষদের কি কি বিশেষ সুযোগ-সুবিধা রয়েছে

প্রথম আলোর প্রতিবেদন থেকে জানতে পেরেছি যে এটি চর এলাকা হলেও এখানে সবুজের কোন কমতি নেই । ইতিমধ্যে এখানে গড়ে উঠেছে ম্যানগ্রোভ বন,  জন্মেছে অনেক শ্বাসমূল।  এই বনের প্রচুর পরিমাণ লবণাক্ত পানি থাকলেও এখানে সুপেয় পানির তেমন কোনো অভাব নেই।  এছাড়া বিভিন্ন জায়গায় বসানো হয়েছে 750 থেকে 800 ফুট গভীর নলকূপ প্রথম দেখাতে কেউ বুঝতে পারবে না যে এই চোরের জীবনধারণের সব সুযোগ-সুবিধা পাওয়া যেতে পারে। 

ভাসানচরে নামার সাথে সাথে সবুজের সমারোহ চোখে পড়ে সেই সাথে রয়েছে প্রচুর গাছপালা এবং মহিষের পাল । এই দ্বীপে স্থানীয় মানুষের সংখ্যা খুবই কম যে গুটিকয়েক লোক রয়েছে তারা এসেছে হাতিয়া,  সন্দ্বীপ,  নোয়াখালী থেকে ব্যবসায়িক এবং পশু পালনের উদ্দেশ্যে। 

আশ্রয়ন ৩ প্রকল্প নামের একটি প্রকল্প রয়েছে যেখানে 32 টি ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান কাজ করছে। এই প্রকল্পের আওতায় রয়েছে 120t ক্লাস্টার হাউস।  প্রতিটি ক্লাসের অধীনে রয়েছে একটি সাইক্লোন শেল্টার।  সাথে পরিবেশের কথা চিন্তা করে ক্লাস্টার হাউসের রান্নাবান্নার জন্য রয়েছে বায়োগ্যাসের বিশেষ সুবিধা।  এছাড়াও প্রতিটি ক্লাসের জন্য রয়েছে সৌর বিদ্যুতের ব্যবস্থা পাশাপাশি জলাশয় ব্যবস্থাপনার রয়েছে দৈনন্দিন পানি সংগ্রহের জন্য। 

এখানে আরো রয়েছে মোট চারটি মসজিদ,  দুটি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং শিশুদের জন্য অনানুষ্ঠানিক ধর্মীয় শিক্ষার ব্যবস্থা।  এছাড়াও চিকিৎসা সেবা প্রদানের জন্য রয়েছে 20 শয্যা হাসপাতাল এবং চারটি কমিউনিটি ক্লিনিক। 


দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মোকাবেলার জন্য যা করা হয়েছে 

যেহেতু ভাসানচরে (vashanchar)  একটি চর এলাকা তাই এখানে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা রাখার প্রয়োজন রয়েছে। দুর্যোগ মোকাবেলার জন্য নেয়া হয়েছে যথেষ্ট পরিমান ব্যবস্থা।  এখানে 176 বছরের ঘূর্ণিঝড় পর্যালোচনা করে প্রতিরোধ ব্যবস্থা হিসেবে মোট 120 টি ক্লাস্টারের প্রত্যেকটিতে একটি করে মোট 120 টি 5 তলা বিশিষ্ট সেন্টার নির্মাণ করা হয়েছে। 

 নৌবাহিনী তথ্যের ভিত্তিতে এখানে প্রতিটি এমন ভাবে প্রস্তুত যা ঘণ্টায় 200 কিলোমিটার ঝড়-বাতাসের মধ্যে থাকবে।  বন্যা,  জোয়ার, জলোচ্ছ্বাস মোকাবেলার জন্য চারপাশে 9 ফুট উঁচু বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে যা ভবিষ্যতে 1904 পর্যন্ত উঁচু হবে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ নৌবাহিনী । বাদের 500 মিটার দূরে পানিতে নির্মাণ করা হয়েছে শোর প্রোটেকশন, যাতে সমুদ্রের বড় ঢেউ থেকে চরকে রক্ষা করা যায়।

এখানকার মানুষের জীবন যাত্রার মান যেমন হবে

ভাসান চরের মানুষদের জীবন যাত্রার মান সম্পর্কে বলতে গেলে বলার মতো তেমন কিছু নেই।  এখানে স্থানীয় লোকের বসবাস খুবই কম।  যারা এখানে থাকে বা কাজ করে তারা দূর-দূরান্ত থেকে এসেছে।  ভাসানচরে পশুপালনের লোকদের আনাগোনা লক্ষ্য করা যায়।  বিশেষ করে এখানে মহিষ পালনের রাখালের সংখ্যা চোখে পড়ার মতো। মহিষের দুধ বিক্রি করার জন্য তাদেরকে নদী পাড়ি দিয়ে বাজারে যেতে হয় । 












কমেন্ট করুন

0 Comments